SafePay Ransomware-এর তাণ্ডব: বিশ্বজুড়ে ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সাইবার হামলার শিকার।
| আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংবাদ
বিশ্বজুড়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে SafePay নামের একটি সক্রিয় Ransomware গোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রের Cybersecurity and Infrastructure Security Agency (CISA), Federal Bureau of Investigation (FBI) এবং আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রকাশিত যৌথ সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে SafePay অন্তত ৬০০টি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত সতর্কবার্তায় জানানো হয়, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এই গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয়েছে।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মতে, SafePay ২০২৬ সালের অন্যতম সক্রিয় Ransomware গোষ্ঠী।
SafePay Ransomware কী?
SafePay হলো একটি Ransomware কার্যক্রম, যার মাধ্যমে আক্রমণকারীরা প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার ও সার্ভারে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এনক্রিপ্ট করে ফেলে।
ফলে আক্রান্ত প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবে নিজেদের ডেটা ব্যবহার করতে পারে না। এরপর আক্রমণকারীরা ফাইল পুনরুদ্ধারের বিনিময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মুক্তিপণ দাবি করে।
SafePay-এর ক্ষেত্রে শুধু ফাইল এনক্রিপ্ট করাই নয়, প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য চুরি করে অনলাইনে প্রকাশের হুমকিও দেওয়া হয়।
এই পদ্ধতিকে Double Extortion বলা হয়।
কীভাবে প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে প্রবেশ করছে হ্যাকাররা?
CISA ও FBI-এর তদন্তে SafePay-এর কয়েকটি প্রধান আক্রমণ কৌশল শনাক্ত হয়েছে।
১. চুরি হওয়া পাসওয়ার্ড ব্যবহার
আক্রমণকারীরা বিভিন্ন উপায়ে ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে প্রবেশের চেষ্টা করে।
২. Brute Force Attack
দুর্বল পাসওয়ার্ড অনুমান করার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপুলসংখ্যক পাসওয়ার্ড পরীক্ষা করা হয়।
৩. VPN-এর দুর্বলতা কাজে লাগানো
প্রতিষ্ঠানের VPN এবং ইন্টারনেট-সংযুক্ত নিরাপত্তা ডিভাইসের দুর্বলতা ব্যবহার করে নেটওয়ার্কে প্রবেশের চেষ্টা করা হয়।
৪. Phishing Attack
ভুয়া ইমেইল, ওয়েবসাইট বা লগইন পেজের মাধ্যমে কর্মীদের অ্যাকাউন্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
৫. পুরোনো নিরাপত্তা দুর্বলতা ব্যবহার
VPN, Firewall এবং অন্যান্য Internet-facing ডিভাইসের পরিচিত নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অননুমোদিত প্রবেশের চেষ্টা করা হয়।
নেটওয়ার্কে প্রবেশের পর কী করে SafePay?
প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে প্রবেশের পর আক্রমণকারীরা সাধারণত কয়েকটি ধাপে কার্যক্রম পরিচালনা করে।
- নতুন Administrator Account তৈরি অথবা বিদ্যমান অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
- নেটওয়ার্কের বিভিন্ন কম্পিউটার ও সার্ভার পর্যবেক্ষণ করে।
- গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও ডেটাবেজ শনাক্ত করে।
- নিরাপত্তা সফটওয়্যার বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করে।
- গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সার্ভারে স্থানান্তর করে।
- প্রতিষ্ঠানের ফাইল এনক্রিপ্ট করে।
- মুক্তিপণ দাবি করে এবং তথ্য প্রকাশের হুমকি দেয়।
CISA-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, SafePay আক্রমণকারীরা PsExec, WinRM এবং Remote Desktop Protocol (RDP)-এর মতো বৈধ IT Management Tool অপব্যবহার করে নেটওয়ার্কের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
Backup System-ও কি নিরাপদ?
এই হামলার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো, SafePay আক্রমণকারীরা প্রতিষ্ঠানের Backup System নষ্ট করার চেষ্টা করে।
CISA-এর তথ্য অনুযায়ী, তারা Windows Shadow Copies মুছে ফেলতে পারে এবং Network Attached Storage (NAS)-এ থাকা ব্যাকআপ ডেটা রিসেট করার চেষ্টা করতে পারে।
এর ফলে প্রতিষ্ঠান শুধু মূল ডেটা নয়, ব্যাকআপ থেকেও তথ্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ হারাতে পারে।
তাই শুধু একই নেটওয়ার্কে ব্যাকআপ রাখাই যথেষ্ট নয়। আলাদা ও Offline Backup রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোন কোন নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগানো হচ্ছে?
CISA ও FBI-এর যৌথ সতর্কবার্তায় SafePay-এর কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত কয়েকটি পরিচিত CVE চিহ্নিত করা হয়েছে।
| CVE নম্বর | সংশ্লিষ্ট পণ্য বা প্রযুক্তি |
|---|---|
| CVE-2020-3259 | Cisco ASA |
| CVE-2023-20269 | Cisco ASA / Firepower |
| CVE-2023-27532 | Veeam Backup & Replication |
| CVE-2024-40711 | Veeam Backup & Replication |
| CVE-2024-40766 | SonicWall SonicOS |
প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংশ্লিষ্ট নির্মাতার নিরাপত্তা আপডেট অনুসরণ করে এসব দুর্বলতা সমাধানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি ISP ও Network Administrator-দের জন্য সতর্কবার্তা
SafePay-এর আক্রমণ কৌশল থেকে বাংলাদেশি ISP, Data Center, Corporate Network এবং Hosting Provider-দেরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে VPN, Firewall, Remote Desktop এবং NAS ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর নিরাপত্তা নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ:
১. VPN এবং Firewall-এর Firmware নিয়মিত আপডেট করুন।
২. সব গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে Multi-Factor Authentication (MFA) চালু করুন।
৩. Administrator Account-এর সংখ্যা সীমিত রাখুন।
৪. অপ্রয়োজনীয় RDP এবং Remote Access বন্ধ রাখুন।
৫. Network Traffic ও Firewall Log নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।
৬. Offline এবং Immutable Backup সংরক্ষণ করুন।
৭. সন্দেহজনক Login এবং অস্বাভাবিক Data Transfer শনাক্তে SIEM ও EDR ব্যবহার করুন।
৮. আক্রান্ত হলে দ্রুত Incident Response শুরু করুন এবং সংশ্লিষ্ট সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাকে জানান।
মুক্তিপণ দেওয়া কি সমাধান?
সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো Ransomware হামলার ক্ষেত্রে মুক্তিপণ না দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
কারণ মুক্তিপণ দিলেও আক্রমণকারীরা যে ডেটা ফেরত দেবে বা চুরি করা তথ্য মুছে ফেলবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
বরং মুক্তিপণ প্রদান ভবিষ্যতে আরও সাইবার অপরাধকে উৎসাহিত করতে পারে।
শেষ কথা
SafePay Ransomware-এর মাধ্যমে ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশেষ করে VPN, Firewall, Server এবং Backup System-এর নিরাপত্তায় সামান্য অবহেলাও একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত Security Audit, Vulnerability Assessment, Access Control এবং Offline Backup নিশ্চিত করতে হবে।
Network Info | প্রযুক্তি, নেটওয়ার্কিং ও সাইবার নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য তথ্য।
প্রতিবেদনের তারিখ: ১ নভেম্বর ২০২৬। তথ্যের ভিত্তি: ২০ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত CISA ও FBI-এর যৌথ নিরাপত্তা সতর্কবার্তা।
মূল সংবাদসূত্র (Sources)
১. CISA – যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা: SafePay Ransomware-এর সরকারি নিরাপত্তা সতর্কবার্তা, ২০ অক্টোবর ২০২৬
২. FBI ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থা: SafePay Ransomware-এর আক্রমণ কৌশল, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও IOCs
৩. Reuters – আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম: SafePay Ransomware বিশ্বজুড়ে ৬০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করেছে
৪. The Record – সাইবার নিরাপত্তা সংবাদ: FBI-এর ৬০০-এর বেশি ভুক্তভোগী সংক্রান্ত প্রতিবেদন
প্রকাশক: Network Info
বিভাগ: সাইবার নিরাপত্তা সংবাদ